Business Plan লেখার নিয়ম
Business plan হলো ব্যবসা কীভাবে চলবে, কাদের কাছে পণ্য বা সেবা বিক্রি হবে এবং আয়-ব্যয়ের হিসাব কীভাবে মিলবে, তার একটি লিখিত পরিকল্পনা। এটি ব্যবসার ধারণাকে নির্দিষ্ট কাজ ও যাচাইযোগ্য অনুমানে রূপ দিতে সাহায্য করে।
শুধু বিনিয়োগকারী বা ঋণের আবেদনের জন্য নয়, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও business plan ব্যবহার করতে পারেন। শুরুতে সংক্ষিপ্ত পরিকল্পনা লিখুন এবং বাস্তব তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা হালনাগাদ করুন।
১. পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ঠিক করুন
কার জন্য business plan লিখছেন, তা আগে নির্ধারণ করুন। নিজের ব্যবসা পরীক্ষা করার পরিকল্পনা এবং বাইরের কোনো প্রতিষ্ঠানে জমা দেওয়ার পরিকল্পনার বিস্তারিত এক রকম নাও হতে পারে।
- নিজের আইডিয়া ও কাজের অগ্রাধিকার পরিষ্কার করা।
- অংশীদারদের দায়িত্ব ও লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
- অর্থায়নের প্রয়োজন ব্যাখ্যা করা।
- চলমান ব্যবসার নতুন পণ্য বা বাজার পরীক্ষা করা।
কোনো প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট কাঠামো বা তথ্য চাইলে তার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিকল্পনা সাজান।
২. ব্যবসার সংক্ষিপ্ত পরিচিতি লিখুন
ব্যবসার নাম, কী বিক্রি করবেন, কোথায় পরিচালনা করবেন এবং কোন পর্যায়ে আছেন, তা লিখুন। ধারণা পর্যায়ে থাকলে সেটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করুন।
নমুনা:
আমরা একটি নির্দিষ্ট এলাকার অফিসকর্মীদের জন্য আগাম অর্ডারভিত্তিক দুপুরের খাবার সরবরাহের পরিকল্পনা করছি। সীমিত মেনু ও নির্ধারিত ডেলিভারি সময় নিয়ে ছোট পরিসরে কার্যক্রম পরীক্ষা করা হবে।
পরিচিতিতে অস্পষ্ট বড় দাবি না করে ব্যবসার কাজ ও প্রাথমিক পরিসর বোঝান।
৩. ক্রেতার সমস্যা ও আপনার সমাধান ব্যাখ্যা করুন
পণ্য বা সেবার তালিকার পাশাপাশি ক্রেতার কোন প্রয়োজন পূরণ করবেন, তা লিখুন। বর্তমান বিকল্প থেকে আপনার প্রস্তাব কীভাবে আলাদা, সেটিও ব্যাখ্যা করুন।
- ক্রেতার নির্দিষ্ট সমস্যা কী?
- তাঁরা এখন কীভাবে সমস্যার সমাধান করছেন?
- আপনার পণ্য বা সেবা কী সুবিধা দেবে?
- সেই সুবিধা নিয়মিত সরবরাহ করা সম্ভব কি?
“সেরা মান” বা “সর্বনিম্ন দাম” লেখার পরিবর্তে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করুন। যেমন নির্ধারিত ডেলিভারি সময়, পরিষ্কার প্যাকেজ বা সীমিত কাজের জন্য নির্দিষ্ট সেবা মূল্য।
৪. Target Customer নির্ধারণ করুন
প্রথমে কাদের কাছে বিক্রি করবেন, তা নির্দিষ্ট করুন। পণ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত অবস্থান, প্রয়োজন, বাজেট ও কেনার অভ্যাস বিবেচনা করুন।
- ক্রেতা ব্যক্তি, পরিবার নাকি প্রতিষ্ঠান?
- কোন এলাকায় থাকেন বা কাজ করেন?
- কত ঘন ঘন পণ্য বা সেবা প্রয়োজন হয়?
- কেনার সিদ্ধান্ত কে নেন?
- কোন মাধ্যমে তাঁদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব?
৫. বাজার ও প্রতিযোগী সম্পর্কে তথ্য লিখুন
সম্ভাব্য ক্রেতার সঙ্গে আলোচনা, ছোট পরীক্ষামূলক বিক্রি এবং বর্তমান বিকল্প পর্যবেক্ষণ থেকে তথ্য সংগ্রহ করুন। তথ্যের উৎস ও সংগ্রহের সময় লিখে রাখুন।
- প্রতিযোগীর পণ্য বা সেবার ধরন।
- মূল্য ও সেই মূল্যের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত সুবিধা।
- অর্ডার ও ডেলিভারির পদ্ধতি।
- ক্রেতার সাধারণ অভিযোগ বা অপূর্ণ প্রয়োজন।
- আপনার সম্ভাব্য সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা।
তথ্য না থাকলে সেটিকে অনুমান হিসেবে চিহ্নিত করুন। যাচাই ছাড়া বাজারের আকার বা ভবিষ্যৎ বিক্রির সংখ্যা নিশ্চিতভাবে লিখবেন না।
৬. পণ্য বা সেবার বিস্তারিত দিন
শুরুতে কী কী বিক্রি করবেন, কী অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং কীভাবে তৈরি বা সংগ্রহ করবেন, তা লিখুন। একসঙ্গে অনেক পণ্য যোগ না করে প্রাথমিক তালিকা সীমিত রাখতে পারেন।
- পণ্যের বৈশিষ্ট্য বা সেবার কাজের পরিধি।
- উৎপাদন বা সরবরাহের উৎস।
- প্রস্তুত করতে প্রয়োজনীয় সময়।
- মান যাচাইয়ের পদ্ধতি।
- প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন, সংশোধন ও ফেরতের শর্ত।
৭. আয় করার পদ্ধতি ও মূল্য নির্ধারণ করুন
ব্যবসায় কোন কাজ থেকে আয় হবে, তা পরিষ্কার করুন। প্রতি পণ্য বিক্রি, project fee, ঘণ্টাভিত্তিক সেবা বা মাসিক package—কোন পদ্ধতি ব্যবহার করবেন, তা উল্লেখ করুন।
মূল্য নির্ধারণে সরাসরি খরচ, নিজের শ্রম, নিয়মিত খরচ এবং ক্রেতার গ্রহণযোগ্যতা বিবেচনা করুন। বিজ্ঞাপন বা বিক্রির খরচও বাদ দেবেন না।
৮. Marketing ও Sales Plan লিখুন
ক্রেতা কীভাবে আপনার ব্যবসা সম্পর্কে জানবেন এবং আগ্রহ থেকে অর্ডার পর্যন্ত কীভাবে এগোবেন, তার ধাপ লিখুন।
- সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর মাধ্যম নির্বাচন।
- নমুনা, ছবি বা পরিষ্কার প্রস্তাব দেখানো।
- প্রশ্নের উত্তর ও মূল্য জানানো।
- অর্ডার ও পেমেন্ট নিশ্চিত করা।
- কাজ শেষ করে মতামত সংগ্রহ করা।
প্রতিটি প্রচারমাধ্যমের জন্য ছোট পরীক্ষার বাজেট ও ফল যাচাইয়ের পদ্ধতি রাখুন। শুধু reach নয়, প্রকৃত অর্ডার এবং ক্রেতা পেতে হওয়া খরচ দেখুন।
৯. দৈনন্দিন পরিচালনার পরিকল্পনা করুন
অর্ডার নেওয়া থেকে ক্রেতার হাতে পণ্য বা কাজ পৌঁছানো পর্যন্ত প্রক্রিয়া লিখুন। কে কোন কাজ করবেন এবং কত অর্ডার সামলাতে পারবেন, তা নির্ধারণ করুন।
- কাজের জায়গা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।
- সরবরাহকারী ও বিকল্প ব্যবস্থা।
- অর্ডার, মজুত ও লেনদেনের হিসাব।
- উৎপাদন, মান যাচাই ও ডেলিভারি।
- ক্রেতার অভিযোগ সমাধানের দায়িত্ব।
- ব্যবসার ধরন অনুযায়ী প্রযোজ্য স্থানীয় শর্ত যাচাই।
১০. আর্থিক পরিকল্পনা তৈরি করুন
আর্থিক অংশে শুধু সম্ভাব্য বিক্রি নয়, ব্যবসা শুরু ও চালানোর প্রয়োজনীয় অর্থ দেখান। সব সংখ্যার পেছনের অনুমান লিখুন।
| অংশ | কী লিখবেন |
|---|---|
| প্রাথমিক খরচ | সরঞ্জাম, নমুনা ও সেটআপের এককালীন খরচ। |
| নিয়মিত খরচ | ভাড়া, বেতন, ইন্টারনেট ও অন্যান্য পরিচালন খরচ। |
| বিক্রিভিত্তিক খরচ | প্রতি অর্ডারের উপকরণ, প্যাকেজিং ও অন্যান্য পরিবর্তনশীল খরচ। |
| বিক্রির পূর্বাভাস | সম্ভাব্য বিক্রির পরিমাণ, মূল্য এবং অনুমানের ভিত্তি। |
| Cash Flow | কখন টাকা আসবে, কখন খরচ হবে এবং নগদ ঘাটতি হতে পারে কি না। |
| অর্থের প্রয়োজন | কত টাকা লাগবে, কোথা থেকে আসবে এবং কী কাজে ব্যবহার হবে। |
বিক্রি হলেই সঙ্গে সঙ্গে টাকা হাতে আসে না। বাকিতে বিক্রি, অগ্রিম পণ্য কেনা বা ডেলিভারির পরে টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে cash flow-তে সেই সময়ের ব্যবধান দেখান।
প্রত্যাশার চেয়ে কম বিক্রি বা বেশি খরচ হলেও ব্যবসা কত দিন চালানো সম্ভব, তার একটি বিকল্প হিসাব রাখুন। পূর্বাভাসকে নিশ্চিত ফল হিসেবে উপস্থাপন করবেন না।
১১. ঝুঁকি ও করণীয় লিখুন
পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অনিশ্চয়তা উল্লেখ করুন। প্রতিটির জন্য কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন, সেটিও সংক্ষেপে লিখুন।
- চাহিদা কম: ছোট পরীক্ষায় প্রস্তাব ও ক্রেতাগোষ্ঠী যাচাই।
- সরবরাহে বিলম্ব: বিকল্প সরবরাহকারী ও সময়ের বাড়তি সুযোগ।
- খরচ বৃদ্ধি: নিয়মিত হিসাব ও প্রয়োজনমতো মূল্য পর্যালোচনা।
- মানের সমস্যা: সরবরাহের আগে নির্দিষ্ট যাচাই।
- নগদ ঘাটতি: টাকা আসা-যাওয়ার সময় পর্যবেক্ষণ।
১২. লক্ষ্য, সময়সীমা ও দায়িত্ব নির্ধারণ করুন
প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, শেষ করার সময় এবং ফল যাচাইয়ের পদ্ধতি রাখুন। একা ব্যবসা করলেও এই তালিকা কাজে আসবে।
- কবে নমুনা বা সেবা package প্রস্তুত হবে?
- কবে সম্ভাব্য ক্রেতার কাছে প্রস্তাব দেখাবেন?
- কত সময় পর খরচ ও বিক্রি পর্যালোচনা করবেন?
- কোন ফলের ভিত্তিতে পরিকল্পনা বদলাবেন?
১৩. Executive Summary শেষে লিখুন
Executive Summary পরিকল্পনার শুরুতে থাকবে, তবে অন্য অংশ লেখা হলে এটি তৈরি করা সহজ হয়। ব্যবসা, ক্রেতা, সমাধান, আয়ের পদ্ধতি ও পরবর্তী লক্ষ্য সংক্ষেপে তুলে ধরুন।
অর্থায়নের জন্য লিখলে কত অর্থ প্রয়োজন এবং কোন কাজে ব্যবহার করবেন, তা উল্লেখ করুন। মূল পরিকল্পনার সঙ্গে না মেলা নতুন দাবি যোগ করবেন না।
Business Plan-এর নমুনা কাঠামো
- Executive Summary।
- ব্যবসার পরিচিতি ও উদ্দেশ্য।
- ক্রেতার সমস্যা ও সমাধান।
- Target Customer ও বাজার বিশ্লেষণ।
- পণ্য বা সেবার বিবরণ।
- আয়ের পদ্ধতি ও মূল্য।
- Marketing ও Sales Plan।
- দৈনন্দিন পরিচালনা ও দায়িত্ব।
- আর্থিক পরিকল্পনা।
- ঝুঁকি, সময়সীমা ও ফল পর্যালোচনা।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
- অন্য ব্যবসার পরিকল্পনা নিজের তথ্য ছাড়া নকল করা।
- ক্রেতার চাহিদা যাচাই না করে বিক্রির পূর্বাভাস দেওয়া।
- নিজের শ্রম ও ছোট নিয়মিত খরচ বাদ দেওয়া।
- বিক্রি, লাভ ও নগদ অর্থকে একই বিষয় ধরে নেওয়া।
- একই খরচ একাধিকবার হিসাব করা।
- বাস্তব ফল পাওয়ার পরও পরিকল্পনা হালনাগাদ না করা।
উপসংহার
Business plan লিখুন ব্যবসার কাজ, ক্রেতা, খরচ ও আয়ের পদ্ধতি পরিষ্কার করার জন্য। নিশ্চিত তথ্য ও অনুমান আলাদা রাখুন এবং প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তের পেছনের ভিত্তি উল্লেখ করুন।
প্রথম খসড়া সংক্ষিপ্ত হতে পারে। ছোট পরীক্ষার ফল, প্রকৃত খরচ ও ক্রেতার মতামত অনুযায়ী পরিকল্পনা সংশোধন করাই এটিকে কার্যকর করে তুলবে।
